তীব্র তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পুরো ইউরোপ। ফ্রান্সে গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) থেকে তাপপ্রবাহের কারণে গোসল করতে গিয়ে ডুবে যাওয়ার ঘটনায় অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশটির বিভিন্ন শহরে ভেঙে গেছে তাপমাত্রার রেকর্ড। ফ্রান্স, স্পেন ও ইতালিতে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু জানিয়েছেন, অতিরিক্ত গরমে মানুষ নদী, খাল ও অনিরাপদ জলাশয়ে সাঁতার কাটতে গিয়ে মৃত্যুর শিকার হচ্ছেন। ক্রীড়া ও যুবমন্ত্রী মারিনা ফেরারি সতর্ক করে বলেছেন, তাপপ্রবাহের সময় নিরাপত্তাহীন স্থানে সাঁতার কাটাকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। খবর বিবিসির।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (২৩ জুন) ফ্রান্সে জুন মাসের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা ২৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। সোমবার (২২ জুন) রাতে গড় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা দেশটির ইতিহাসে জুন মাসের সবচেয়ে উষ্ণ রাত। দেশটির অর্ধেকের বেশি এলাকায় জারি করা হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতা।
মৃতদের মধ্যে রয়েছে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরী, যিনি পরিবারের সঙ্গে সাইন নদীতে নামার পর ডুবে যান। এছাড়া লিয়নের কাছে রোন নদীতে সাঁতার কাটতে গিয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন এক তরুণ ফুটবলার। দক্ষিণাঞ্চলীয় কারপেনত্রাস শহরে একটি পার্কিংয়ে পরিবারের গাড়ির ভেতরে দুই ও চার বছর বয়সী দুই শিশুর মরদেহও উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের মৃত্যুর জন্য তীব্র গরমকে দায়ী করা হচ্ছে।
স্পেনেও তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় আন্দালুসিয়া এবং উত্তরের কান্তাব্রিয়া ও বাস্ক অঞ্চলে জারি করা হয়েছে রেড অ্যালার্ট। সোমবার স্পেনের ৮২৮টি আবহাওয়া কেন্দ্রের মধ্যে ১০১টিতে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির বেশি রেকর্ড করা হয়েছে। আন্দুজার শহরে সর্বোচ্চ ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়।
ইতালির রোম, মিলান, ফ্লোরেন্স, তুরিন ও ভেনিসসহ ১৫টি শহরে জারি করা হয়েছে রেড অ্যালার্ট। সরকার কৃষি ও নির্মাণশ্রমিকদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছে, যাতে দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে কাজ বন্ধ রাখা যায়।
তাপপ্রবাহের কারণে প্যারিসের আইফেল টাওয়ার মঙ্গলবার নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থীর জাদুঘর ল্যুভরও বুধবার থেকে শনিবার পর্যন্ত স্বাভাবিক সময়ের দুই ঘণ্টা আগে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অন্যদিকে দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের গোলফেক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কারণ, চুল্লি শীতল করার জন্য ব্যবহৃত গ্যারোন নদীর পানির তাপমাত্রা ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জার্মানি, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসেও চলতি সপ্তাহে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের আবহাওয়া বিভাগ দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলে ‘কোড অরেঞ্জ’ সতর্কতা জারি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইউরোপ বিশ্বের অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় দ্বিগুণ দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে। এর ফলে তাপপ্রবাহ, দাবানল ও পানিসংকটের ঝুঁকি বাড়ছে। গত বছরেও ইউরোপে ১০ লাখ হেক্টরের বেশি এলাকা দাবানলে পুড়ে যায়, যা ছিল রেকর্ড।
এফপি/অ