দেশের মসলার বাজারে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী এলাচ, জিরা ও লবঙ্গসহ গুরুত্বপূর্ণ মসলার আমদানি কমে এলেও বাজারে কোনো দৃশ্যমান ঘাটতি নেই। বরং পাইকারি ও খুচরা বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও দাম ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী, যা সাধারণ ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের প্রথম চার মাসে এলাচ আমদানি কমে প্রায় ৪৪০ মেট্রিক টনে নেমেছে, যেখানে আগের বছর একই সময়ে ছিল প্রায় ৫৮৭ মেট্রিক টন। একই সময়ে জিরা ও লবঙ্গের আমদানিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে আমদানি কমার পরও বাজারে ঘাটতি না থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
কাস্টমসের হিসাবে প্রতি কেজি এলাচ আমদানিতে শুল্কসহ ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ৪৬৬ টাকা। অথচ খুচরা বাজারে একই এলাচ বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ৬০০ থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকায়। লবঙ্গের আমদানি ব্যয় যেখানে প্রায় ৭৬৫ টাকা, সেখানে বাজারমূল্য প্রায় দ্বিগুণ। দারুচিনি ও জিরার ক্ষেত্রেও একই ধরনের বড় ব্যবধান লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে কম দামে এলসি খোলা হয় এবং প্রকৃত মূল্যের একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়। এতে কাগজে আমদানি ব্যয় কম দেখালেও প্রকৃত লেনদেন আড়ালেই থেকে যায়। পাশাপাশি সীমান্তপথে চোরাচালানের মাধ্যমে বড় পরিমাণ মসলা দেশে প্রবেশ করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরাও বাজার পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন মত দিয়েছেন। হাজী জসিম ট্রেডার্সের কর্মকর্তা জিহান জানান, আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা ও পরিবহন ব্যয়ের কারণে স্থানীয় বাজারে প্রভাব পড়লেও পণ্যের ঘাটতি নেই। একই বাজারের আরেক ব্যবসায়ী বলেন, বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও মূল্য নির্ধারণে অস্বচ্ছতা রয়েছে বলে তারা মনে করেন।
এ বিষয়ে স্থানীয় ভোক্তাদের মধ্যেও ক্ষোভ রয়েছে। রফিকুল ইসলাম বলেন, বাজারে পণ্য থাকলেও দাম অনেক বেশি, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। চাক্তাই এলাকার কামাল উদ্দিন বলেন, প্রতিদিনই কোনো না কোনো পণ্যের দাম ওঠানামা করছে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের মসলার বাজারের একটি বড় অংশ,প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, চোরাচালানের মাধ্যমে আসছে। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে এবং বৈধ আমদানিকারকরাও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।
ট্যারিফ কমিশনের পূর্ববর্তী এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, দেশে মসলার চাহিদার তুলনায় বৈধ আমদানি প্রায় ৪৩ শতাংশ কম, যা দীর্ঘদিন ধরেই অনানুষ্ঠানিক উৎস দিয়ে পূরণ হয়ে আসছে।
ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, গত তিন বছরে মসলার দামে উল্লেখযোগ্য ওঠানামা হয়েছে। ২০২৪ সালের ১০ মে এলাচ বিক্রি হয়েছিল ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৮০০ টাকায়, লবঙ্গ ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা, দারুচিনি ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা এবং জিরা ৬৫০ থেকে ৮৫০ টাকায়।
২০২৫ সালের ১০ মে এলাচের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকায়। একই সময়ে লবঙ্গ কিছুটা কমে ১ হাজার ৩৬০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা, দারুচিনি ৫০০ থেকে ৫৮০ টাকা এবং জিরা ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকার মধ্যে ছিল।
২০২৬ সালের ১০ মে এলাচ বিক্রি হয়েছে ৪ হাজার ৬০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকায়। লবঙ্গ ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা, দারুচিনি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং জিরা ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
এলাচের বাজারে ধারাবাহিক উচ্চমূল্য বজায় থাকলেও অন্যান্য মসলার দামে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা রয়েছে। তবে আমদানি ব্যয় ও বাজারদরের মধ্যে বড় ব্যবধান কেবল সাধারণ বাজার প্রক্রিয়ার ফল নয়, বরং এর পেছনে কাঠামোগত অস্বচ্ছতা কাজ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্ডার ইনভয়েসিং, হুন্ডির মাধ্যমে অর্থপ্রবাহ এবং সীমান্ত চোরাচালান, এই তিনটি উপাদান মিলেই মসলার বাজারে এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ফলে একদিকে যেমন রাজস্ব ক্ষতি বাড়ছে, অন্যদিকে ভোক্তাদের জন্য বাজার আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে।
এফপি/অ