রংপুর মহানগরীজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন খাল, নর্দমা ও ড্রেন পরিণত হয়েছে মশার উর্বর প্রজনন ক্ষেত্র। গত ২-বছর ধরে মশা নিধনে রংপুর সিটি কর্পোরেশনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না থাকায় ভয়াবহ মশার প্রকোপ দেখা দিয়েছে রংপুর নগরীতে। নগরবাসীরা অভিযোগের সুরে বলছেন, সিটি কর্পোরেশনের গাফিলতির কারণেই তৈরি হয়েছে এমন পরিস্থিতি।
রংপুর মহানগরীর সেনপাড়া, মিস্ত্রী পাড়া, কেরানি পাড়া, গুপ্ত পাড়া, পাশারী পাড়া, রাধা বল্লভ, বাবু পাড়া, পাল পাড়াসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মশার আক্রমণ থেকে রক্ষায় দিনেও বাসা-বাড়িতে টাঙ্গাতে হচ্ছে মশারি। অনেক বাসা-বাড়িতে রাতের ন্যায় দিনেও বন্ধ রাখতে হয় দরজা-জানালা। মশার যন্ত্রণা থেকে রক্ষায় মশারি, স্প্রে কিংবা কয়েল কাজে আসছে না কোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা।
নগরবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নগরীর লাইফলাইন শ্যামা সুন্দরী খাল, কেডি খাল ও ড্রেন গুলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন না করায় ময়লার ভাগারে পরিণত হয়েছে। যে কারণে প্রজনন বাড়ছে মশাসহ বিভিন্ন ক্ষতিকারক কীট-পতঙ্গের। নগর ভবনের উদাসীনতায় সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করছে।
এ ব্যাপারে কেড়ানিপাড়া এলাকার বাসিন্দা শারাতুল ইসলাম বলেন, “ছোট থেকে দেখলাম না আমাদের শ্যামা সুন্দরী খালটা সংস্কার করা হয়েছে। যে কারণে ময়লা আবর্জনায় ভরা এই খাল এখন মশার কারখানায় পরিণত হয়েছে। মশার কামড়ে এলাকার অনেক মানুষ বিভিন্ন মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অথচ সিটি কর্পোরেশন উদাসীন।”
নগরীর সেন পাড়ার বাসিন্দা বিলকিস বেগম বলেন, “মশার অত্যাচারে আমরা অতিষ্ঠ। দিন কিংবা রাত সমানভাবে মশার উৎপাত চলছে। মশা ও অপরিচ্ছন্নতার কারণে বাচ্চারা বিভিন্ন চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছে, মশা বাহিত রোগে নাস্তানাবুদ বয়স্করাও।”
একই এলাকার আরেক বাসিন্দা সিঁথি রানী বলেন, “একটু বৃষ্টি হলেই শ্যামা সুন্দরীতে মশার উৎপাত বেড়ে যায়। বিকেল থেকে মশার উপদ্রব এত বেড়ে যায় যে মশারির ভেতর ছাড়া থাকা যায় না। অথচ সিটি করপোরেশন থেকে মশা নিয়ন্ত্রণে কোন উদ্যোগই চোখে পড়ে না।”
নগরীর পাসারি পাড়া এলাকার বাসিন্দা রবিউল ইসলাম বলেন, “শ্যামা সুন্দরী আমাদের গলার কাঁটায় পরিনত হয়েছে। এই খাল এত ময়লা আবর্জনায় ভরে গেছে যে মশা মাছির উৎপাদন কারখানায় পরিণত হয়েছে। আমরা চাই এই শ্যামা সুন্দরী খাল সংস্কার করে আমাদের রক্ষা করুক। আমরা আর এই মশার অত্যাচার নিতে পারছি না।”
নগরীর নজরুল, এনামুল, আবুল খয়ের, সেলিম, আকাশ ও রাজু মিয়াসহ স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এক সময় শ্যামাসুন্দরী খালটি ঘাঘট নদী থেকে শুরু হয়ে নগরীর ধাপ, পাশারীপাড়া, কেরানীপাড়া, মুন্সিপাড়া, ইঞ্জিনিয়ারপাড়া, গোমস্তাপাড়া, সেনপাড়া, মুলাটোল, তেঁতুলতলা, নূরপুর ও বৈরাগীপাড়া হয়ে মাহিগঞ্জের মরা ঘাঘটের সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিন্তু এখন ময়লা আবর্জনার কারণে খালটি সংকুচিত হয়ে এসেছে। এক সময়কার ১৮ কিলোমিটার খালতি এখন মাত্র কয়েক কিলোমিটারে চলে এসেছে। যে কারণে ময়লা আর ঝোপঝাড় বৃদ্ধি পাওয়ায় তৈরি হয়েছে মশার প্রজনন কেন্দ্রে।
কেডি খালসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম, মঞ্জুরুল মিয়া ও রাকিব হোসেন বলেন, “শ্যামাসুন্দরীর চেয়েও কেডি খালে বেশি মশা জন্ম নিচ্ছে। খাল, ড্রেন ও জলাশয় নিয়মিত পরিষ্কার না করায় পুরো নগরীতেই মশার বিস্তার ঘটছে। এতে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।”
রংপুর সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা যায়, গাফিলতি নয় মশক নিধনে গত দুবছরে কোন বাজেট পায়নি রংপুর সিটি কর্পোরেশন। তবে চলতি অর্থ বছরে সরকার থেকে কোনো বাজেট না এলেও সিটি কর্পোরেশন মশক নিধনে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয় করেছে। ইতিমধ্যে ৭২ টি ফগার মেশিন, ২০০ লিটার করে লার্ভিসাইড ও এডাল্টিসাইড, ৫০০ লিটার তেল কেনা হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে সকালে লার্ভিসাইড ও বিকেলে এডাল্টিসাইড দেয়া হচ্ছে। এ ছাড়াও বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে বিভিন্ন খাল ও ড্রেন পরিস্কার করা হচ্ছে।
রংপুর সিটি কর্পোরেশন-এর পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান মিজু বলেন, “এবার মশা উৎপাত অনেক বেশি হওয়ায় সিটি কর্পোরেশন হতে ব্যাপক কর্মসূচি নিয়েছে। ইতিমধ্যে ৭২ টি ফগার মেশিন, ২০০ লিটার করে লার্ভিসাইড ও এডাল্টিসাইড, ৫০০ লিটার তেল কেনা হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে সকালে লার্ভিসাইড ও বিকেলে এডাল্টিসাইড দেয়া হচ্ছে।”
রংপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মাহাফুজ উন নবী ডন বলেন, “প্রতিটি ওয়ার্ডে ফগার মেশিন ও স্প্রে মেশিন দিয়ে মশার ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। নগরবাসী যেন মশার উপদ্রব থেকে রেহাই পায় সে জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। আশাকরি অতীতের যে কোন সময়ের থেকে এবার ভালোভাবে মশার উৎপাদ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।”
এফপি/অ