হাওর, বাওর আর ভাটির জনপদ হিসেবে পরিচিত সুনামগঞ্জ জেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে শুরু হয়েছে আগাম বোরো ধান কাটা। জেলার বিভিন্ন হাওর ঘুরে দেখা গেছে, আগাম পাকা দেশি ও উন্নত জাতের ধান বর্তমানে বিচ্ছিন্নভাবে কাটা হচ্ছে। তবে আগামী সপ্তাহ থেকে পুরোদমে ধান কাটার কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
তাহিরপুর, দিরাই, জগন্নাথপুর, শাল্লা, জামালগঞ্জ ও ধর্মপাশাসহ বিভিন্ন উপজেলার হাওরগুলোতে প্রতিদিনই কিছু কিছু জমির ধান কাটা হচ্ছে। মাঠে কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিনের পাশাপাশি স্থানীয় শ্রমিকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। একই সঙ্গে ধান মাড়াই ও শুকানোর কাজে কৃষাণীরাও সমানতালে কাজ করছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রায় ৫৫ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। চলতি মৌসুমে জেলায় মোট ২ লাখ ২৩ হাজার ৫২৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। সব ফসল ঘরে উঠলে আনুমানিক সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে চলতি মৌসুমের শুরুতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে কিছু ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে। গত মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে শিলাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টির কারণে হাওরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। সরকারি হিসেবে ১২১ হেক্টর জমি শিলাবৃষ্টিতে এবং ৩ হাজার ১৮৯ হেক্টর জমি জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও স্থানীয় কৃষকদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি।
জামালগঞ্জ উপজেলার লক্ষীপুর গ্রামের কৃষক মো. সাত্তার বলেন, “হাইব্রিড ও উন্নত জাতের ধানে ভালো ফলন হয়েছে। যদি আবহাওয়া অনুকূলে থাকে, তাহলে এবার ভালো ফলনের আশা করছি।”
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার খরচার হাওরের কৃষক ও সমাজকর্মী সোলেমান তালুকদার জানান, ২০ কেয়ার জমিতে আগাম জাতের ব্রি-৯৬ ধান আবাদ করেছেন, যার মধ্যে ইতোমধ্যে সাড়ে তিন কেয়ার ধান কাটা হয়েছে। প্রতি কেয়ারে প্রায় ১৮ মণ ফলনের আশা করছেন তিনি।
তাহিরপুর উপজেলার মাটিয়ান হাওরের কৃষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, “বৃষ্টির কারণে অনেক জায়গায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এতে হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই পর্যাপ্ত শ্রমিক নিশ্চিত করা জরুরি।”
সরেজমিনে জামালগঞ্জ, তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বিভিন্ন হাওরে গিয়ে দেখা গেছে, পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টির কারণে কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতায় ধান নষ্ট হওয়ায় কৃষকরা কমপাকা ধানও কাটতে বাধ্য হচ্ছেন। পাকনার হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওর, দেখার হাওর, খরচার হাওর, ধানকুনিয়ার হাওর, শনির হাওর ও নলুয়ার হাওরে উৎসবমুখর পরিবেশে আগাম ধান কর্তন চলছে।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, জেলায় ধান কাটায় বর্তমানে প্রায় ৬ হাজার শ্রমিক ও ৫৭৭টি কম্বাইন হারভেস্টার কাজ করছে। হারভেস্টার পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি তেলও মজুদ রয়েছে। ব্রি-২৮ ও ব্রি-৯৬ জাতের ধান কাটার কাজ শুরু হয়েছে, যা ফলন ও স্বাদে ভালো হওয়ায় কৃষকদের কাছে দিনদিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এসব জাতের ধানে প্রতি বিঘায় ১৫ থেকে ১৮ মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়া যাচ্ছে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ওমর ফারুক জানান, এ বছর জেলায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫০৫ হেক্টর জমিতে ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। বর্তমানে বিভিন্ন হাওরে বিচ্ছিন্নভাবে ধান কাটা শুরু হয়েছে এবং আগামী সপ্তাহ থেকে পুরোদমে কার্যক্রম শুরু হবে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবারও বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক ড. ইলিয়াস মিয়া বলেন, বিভিন্ন হাওরে ধান কাটা শুরু হয়েছে। কৃষকদের সোনালী ফসল ঘরে তুলতে জেলা প্রশাসন সর্বাত্মক সহযোগিতা করে যাচ্ছে।
এফপি/জেএস