আজ সকালে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি আয়োজিত “যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তি - বাংলাদেশের স্বার্থের প্রশ্ন” শীর্ষক মতবিনিময় সভার সভাপতি বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেছেন, বিএনপির জন্য দেশপ্রেমের প্রথম বড় পরীক্ষা হচ্ছে কঠোর গোপনীয়তায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাক্ষর করা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী অন্যায় ও অন্যায্য বাণিজ্য চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা।
যেহেতু বিএনপির কাছে “সবার আগে বাংলাদেশ”, সেহেতু দেশপ্রেমের পরীক্ষায় বিএনপি সরকারকে একশোতে একশো নম্বর পেতে হবে এবং দ্রুত রাজনৈতিক ও জনগণকে সাথে নিয়ে দেশের স্বাধীনতা ও জাতীয় নিরাপত্তা বিরোধী এই বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের উদ্যোগ নিতে হবে। সমতা, ন্যায্যতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নতুন বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি বলেন, মাননীয় এক প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী বিএনপির হাতে জাতীয় অর্জনের যে তিনটি ট্রফি রয়েছে বিএনপি সরকারকে অবশ্যই তার মর্যাদা রক্ষা করতে হবে।
আর লিখিত বক্তব্যে সাইফুল হক বলেন, গত ৯ ফেব্রুয়ারী জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিনদিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে কেন বিতর্কিত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করলো তার কোন সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।যে চুক্তি বাস্তবায়নে তাদের কোন কোন দায় নেই কেন তারা একটি নির্বাচিত সরকারের কাঁধে এরকম একটি ভয়ংকর চুক্তি চাপিয়ে দিয়ে গেল এ পর্যন্ত তারও কোন সদুত্তর মেলেনি।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে বাণিজ্য চুক্তির নামে বাংলাদেশের বিনিয়োগ, ডিজিটাল বাণিজ্য, শিল্প, কৃষি, জ্বালানি, প্রতিরক্ষাসহ বিস্তৃত ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যায় ও অন্যায্য হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দিয়েছে।
তিনি বলেন, চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের রফতানি নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশকেও মেনে চলতে হবে, আমদানি করা মার্কিনী কোন পণ্যের গুণগত মান পরীক্ষা করা যাবেনা।
চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ এমন কোন দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লী, জ্বালানি বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনতে পারবেনা যা যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ’ বিবেচিত হবে।। চুক্তির ধারা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় গৃহীত সীমান্ত বা বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞামূলক ব্যবস্থার সাথে মিল রেখে বাংলাদেশকেও ‘পরিপূরক বিধিনিষেধ’ এর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এর অর্থ হচ্ছে! মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অথবা বাণিজ্যিকযুদ্ধে বাংলাদেশকেও তার অনুরূপ অবস্থান গ্রহণ করতে হবে’ পরাশক্তির দ্বন্দ্ব - সংঘাতে বাংলাদেশ নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে পারবেনা। আর “কিছু নির্দিষ্ট দেশ” থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনাকাটা কমাতে হবে, যা আসলে চীনের দিকেই ইংগিত করে।
চুক্তির ধারা অনুসারে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের দেওয়া খাদ্য ও কৃষিপণ্যের সনদ বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যের জন্য বাংলাদেশের বাজারে বৈষম্যহীন কিংবা অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার থাকবে।
দীর্ঘ চুক্তির নানা ধারার শর্তে এটা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, এই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বাংলাদেশের উপর অন্যায়, অবমাননাকর ও আপত্তিজনক বেশী শর্ত চাপানো হয়েছে।
তিনি বলেন, চুক্তির সামগ্রিক পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, বাংলাদেশের সাথে স্বাক্ষরিত এই কথিত বাণিজ্য চুক্তিকে প্রকারান্তরে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ও সামরিক স্বার্থজনীত নীতিকৌশলের অংশ হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে।চুক্তিতে এমন সব শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে যা বাংলাদেশের নীতিগত স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে নিক্ষেপ করবে।
বাণিজ্যকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে যেয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা গুরুতরভাবে হুমকির মুখোমুখি করা হয়েছে। কোন স্বাধীন সার্বভৌম আত্মমর্যাদা দেশ ও তার জনগণ এই ধরনের অন্যায় ও একপাক্ষিক চুক্তি গ্রহণ করতে পারেনা।
তিনি বলেন, আলোচিত এই চুক্তি ৬০ দিনের নোটিশে বাতিল করার শর্ত আছে।নতুন সরকার সে পথে হাটতে পারে। জনগুরুত্ব বিবেচনা করে দ্রুত বর্তমান জাতীয় সংসদে এটা নিয়ে আলোচনা হতে পারে; বাণিজ্য সংক্রান্ত সংসদীয় বিশেষ কমিটিতে পূর্ণাংগ পর্যালোচনার পর এই চুক্তির অন্যায্যতা দেখিয়ে সরকার এই চুক্তি বাতিল করতে পারে।
মতবিনিময় সভায় সিপিডির গবেষণা পরিচালক বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এই চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশকে বেশী দাম দিয়ে মার্কিন পণ্য কিনতে হবে। তিনি বলেন, মার্কিন শুল্ক ৩৫ % থেকে ১৯% নেমে এলেও তাতে বাংলাদেশের রফতানি বাড়েনি। এই চুক্তি বহাল থাকলে বাংলাদেশ স্বাধীনভাবে অন্যান্য দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক বানিজ্যিক চুক্তি করতে পারবেনা।তিনি বলেন, এই চুক্তিতে বাংলাদেশের প্রতিকূলে বাণিজ্যিক বৈষম্য আর বাড়বে।কারণ এই চুক্তিতে প্রাপ্তির চেয়ে বঞ্চনা অনেক বেশী। এটা কোনভাবেই মুক্তবাণিজ্যের চুক্তি নয়।এই চুক্তি কোনভাবেই গ্রহণ করা যাবেনা।
গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য এডভোকেট জগলুল হায়দার আফ্রিক বলেন, এই চুক্তি কোনভাবেই মেনে নেয়া হবেনা।
মতবিনিময় সভায় আরও বক্তব্য রাখেন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিষদের আহবায়ক শেখ আবদুন নূর, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য বহ্নিশিখা জামালী, আকবর খান প্রমুখ।
এফপি/জেএস