একসময় পরিচ্ছন্ন ও শান্ত শহর হিসেবে পরিচিত রাজশাহী আজ ধীরে ধীরে নদী দূষণের এক উদ্বেগজনক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। শহরটিতে বড় শিল্পকারখানার সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও অপরিকল্পিত নগরায়ন, দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণের অভাব মিলেই নদী দূষণের প্রধান কারণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে শহরের আশেপাশে অবস্থিত কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং বিসিক শিল্প এলাকায় পানি দূষণকারী কারখানাগুলোর অধিকাংশেরই কার্যকর বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা নেই। অনেক ক্ষেত্রে কারখানাগুলোতে Effluent Treatment Plant (ETP) নেই বললেই চলে। ফলে এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে উৎপন্ন তরল বর্জ্য কোনো ধরনের পরিশোধন ছাড়াই সরাসরি শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থায় ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত নদীতে গিয়ে মিশছে।
এদিকে নগরজুড়ে দ্রুত বেড়ে ওঠা হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোও পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। শহরে নতুন নতুন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের নিজস্ব বর্জ্য শোধনাগার বা ETP নেই। চিকিৎসা কার্যক্রম থেকে উৎপন্ন তরল বর্জ্য সরাসরি ড্রেনে ফেলে দেওয়া হচ্ছে, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে রাজশাহী শহরের পুরোনো ও উন্মুক্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা। এখানে নিকাশির জন্য আলাদা কোনো সিউয়েজ লাইন নেই; বরং গৃহস্থালি বর্জ্য, শিল্প বর্জ্য এবং অন্যান্য নোংরা পানি একই খোলা ড্রেনে প্রবাহিত হয়। এসব ড্রেনের পানি শেষ পর্যন্ত পার্শ্ববর্তী খাল ও নদীতে গিয়ে মিশে জলজ পরিবেশকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে।
নদী দূষণের আরেকটি বড় কারণ শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুরবস্থা। সিটি হাট এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে খোলা স্থানে বর্জ্য ফেলা বা “ওপেন ডাম্পিং” একটি বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। এখানে প্রতিদিন শহরের বিপুল পরিমাণ কঠিন বর্জ্য জমা হয়। বৃষ্টির সময় এসব বর্জ্য থেকে নির্গত দূষিত পানি আশেপাশের জমি, নালা এবং জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই দূষিত পানি নদীতে গিয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে নদীর পানি ও পরিবেশের গুণগত মান নষ্ট করে দেয়। ফলে রাজশাহীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এখন সরাসরি নদী দূষণের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, শহরে আধুনিক ও আবদ্ধ ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে গৃহস্থালি সিউয়েজের জন্য আলাদা নিকাশির ব্যবস্থা থাকবে। এতে করে অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে যাওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে। একই সঙ্গে সিটি হাট এলাকায় খোলা বর্জ্য ফেলার প্রথা বন্ধ করে পরিকল্পিত স্যানিটারি ল্যান্ডফিল বা আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।
অন্যদিকে শহরের প্রতিটি শিল্পকারখানায় কার্যকর ETP স্থাপন নিশ্চিত করা দরকার, যাতে তরল বর্জ্য পরিশোধনের পর পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ২০২৩ (ECR 2023) অনুযায়ী নির্ধারিত মান বজায় রেখে নালায় ছাড়া হয়। এখানে বর্জ্যের পরিমাণের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দূষণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা। একইভাবে হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতেও বাধ্যতামূলকভাবে বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন করা জরুরি, যাতে চিকিৎসা বর্জ্য পরিবেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি না করে।
যদি স্থানীয় প্রশাসন, বিশেষ করে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন ও পরিবেশ অধিদপ্তর সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করে, তবে এই সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান সম্ভব।
সব মিলিয়ে রাজশাহীর নদী দূষণ এখন আর ছোট কোনো সমস্যা নয়, এটি শহরের পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। যথাযথ পরিকল্পনা, কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং সচেতন উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব।
এফপি/জেএস