পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন সোহাগ মোল্লা। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর বাস্তব হয়নি। ক্যাম্বোডিয়ার এক অচেনা হাসপাতালে নিঃশব্দে থেমে গেছে তার জীবন। মানবপাচারকারীদের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারানো সোহাগ মোল্লা ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার উমেদপুর ইউনিয়নের বাহির-রয়েড়া গ্রামের দিনমজুর বিল্লাল মোল্লার ছেলে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, “ক্ষুদ্র রয়েড়া গ্রামের জামিরুল শেখের ছেলে রয়েল শেখ নামের এক মানবপাচারকারীর ফাঁদে পড়েন সোহাগ।” দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্বোডিয়ায় অবস্থানরত রয়েল নিজেকে বৈধ কর্মসংস্থানের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে এলাকায় দরিদ্র যুবকদের বিদেশে নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আসছিল। দেড় থেকে এক লাখ পঁচাত্তর হাজার টাকা মাসিক বেতনের আশ্বাস দিয়ে গত ৮ মাস আগে সোহাগের পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ৮ লাখ টাকা আদায় করে নেয় সে।
“ক্যাম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পরই ভেঙে পড়ে সেই স্বপ্ন। সেখানে সোহাগকে জিম্মি করে অনৈতিক ও অবৈধ কর্মকাণ্ডে বাধ্য করা হয়। প্রতিবাদ করলেই শুরু হতো অমানবিক শারীরিক নির্যাতন। ঠিকমতো খাবার, চিকিৎসা কিংবা বেতনের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। একটানা ১০ থেকে ১৫ দিন খাবার না দিয়ে শুধু পানি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার মতো পাশবিক আচরণ করা হতো বলে জানিয়েছেন সহভুক্তভোগীরা।” নির্যাতনের মাত্রা সহ্যসীমা ছাড়ালে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন সোহাগ। যথাযথ চিকিৎসা না দিয়ে শেষ পর্যন্ত গত ১ জানুয়ারি ক্যাম্বোডিয়ায় তার মৃত্যু হয়।
“সেখানে বসবাসরত প্রবাসীদের বরাতে জানা গেছে, গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় বালিশ চাপা দিয়ে হত্যার পর কৌশলে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে মৃত্যুকে স্বাভাবিক বলে চালানোর চেষ্টা করে পাচারচক্র।”
নিহত সোহাগের মা সোহাগী খাতুন চোখের জলে বলেন, “অনেক স্বপ্ন নিয়ে ছেলেকে বিদেশে পাঠাই। ওর বাবা দিনমজুর মানুষ। এনজিও, সুদের ঋণ আর আত্মীয়দের কাছ থেকে টাকা এনে ৮ লাখ দিয়েছি। আজ আমার ছেলের লাশটাও দেশে আনতে পারছি না। বিচার হোক বা না হোক, অন্তত আমার ছেলের মুখটা একবার দেখতে চাই।”
তিনি আরও জানান, প্রথম দুই মাসে সোহাগ দেশে ৬০ হাজার টাকা পাঠালেও পরে ফোনে জানায় তাকে অনৈতিক কাজে বাধ্য করা হচ্ছে। রাজি না হওয়ায় নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়। তিনি ছেলে হত্যার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন।
সোহাগের চাচাতো ভাই ইব্রাহীম মোল্লা, যিনি একই ফ্লাইটে ক্যাম্বোডিয়া গিয়েছিলেন এবং সম্প্রতি দেশে ফিরেছেন। তিনি জানান, “ওখানে যা করেছে, ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। যৌন নির্যাতনসহ সব ধরনের অবৈধ কাজে বাধ্য করা হতো। রাজি না হলে মারধর, ইনজেকশন পুশ সবই করেছে। আর কিছুদিন থাকলে আমিও মারা যেতাম।”
এলাকাবাসীর অভিযোগ, মানবপাচারকারী রয়েল অন্তত ১৫ জন যুবককে একইভাবে ক্যাম্বোডিয়ায় পাঠিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। অল্প সময়েই ভাঙা ঘর থেকে গড়ে তুলেছে আলিশান বাড়ি। তারা রয়েলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে বলেন, এমন শাস্তি দিতে হবে যেন ভবিষ্যতে কেউ আর এ ধরনের মানবপাচারে জড়াতে সাহস না পায়।
অভিযুক্ত রয়েলের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। তার গ্রামের বাড়ি ক্ষুদ্র-রয়েড়ায় গিয়ে বাড়ি তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। স্থানীয়দের দাবি, তার পিতামাতাও গা-ঢাকা দিয়েছেন।
শৈলকুপা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হুমায়ুন কবির বলেন, “এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত থানায় লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এফপি/জেএস