ময়মনসিংহের ভালুকায় 'সমঝোতা' প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় মোঃ বাপ্পী আহমেদ নামে এক ব্যক্তিকে মাদক মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছে।
ভালুকা মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোঃ বিলায়েত হোসেনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় এসআই বিলায়েতসহ পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ময়মনসিংহ রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী।
অভিযোগে অভিযুক্ত অন্যরা হলেন, এএসআই মেহেদী হাসান, এএসআই তোফাজ্জল হোসেন, এএসআই সালাউদ্দিন ও এএসআই আনোয়ার হোসেন।
জানা গেছে, গত ২৩ জুন ভোরে উপজেলার হবিরবাড়ী ইউনিয়নের জামিরদিয়া ইম্প্রেসিভ মোড় এলাকায় মৃত আব্দুস ছামাদ মিয়ার ছেলে সবুজ মিয়াকে ২৫ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করা হয়। এ অভিযানে এসআই বিলায়েত হোসেনের নেতৃত্বে অন্যান্য অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা অংশ নেন। পরে এসআই বিলায়েত বাদী হয়ে একটি মাদক মামলা দায়ের করেন, যেখানে বাপ্পী আহমেদকে পলাতক আসামি করা হয়। এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক মিথ্যা মামলা থেকে অব্যাহতি ও ন্যায় বিচার চেয়ে ময়মনসিংহ রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করছেন ভুক্তভোগী বাপ্পী আহমেদ।
অভিযোগে বাপ্পী আহম্মেদ বলেন, তিনি নেত্রকোনা জেলার খালিয়াজুড়ি উপজেলার বল্লী গ্রামের মোঃ আব্দুল হকের ছেলে, দীর্ঘদিন ধরে হবিরবাড়ী ইউনিয়ানের জামিরদিয়া ইম্প্রেসিভ মোড় এলাকার কাজিম উদ্দিন (কাজি মেম্বার)'র বাসায় ভাড়া থেকে একটি ছোট ডাল-পুড়ির দোকান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। বিভিন্ন সময় পুলিশ সদস্যরা তার দোকানে এসে এলাকার বিভিন্ন ব্যক্তি সম্পর্কে তথ্য নিতেন। পরিচিত মানুষ হিসেবে তিনি যতটুকু জানতেন, ততটুকুই জানাতেন। তবে কয়েক মাস আগে এসআই বিলায়েত হোসেন একদিন হোয়াটসঅ্যাপে কল করে তাকে থানায় ডাকেন। থানায় গেলে এসআই বিলায়েত তাকে উদ্দেশ করে বলেন, 'তোকে হেরোইন দিয়ে মামলা দেব।' কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'আমি গোপালগঞ্জের লোক। সাভার-আশুলিয়ায় চাকরি করার সময় তোর মতো অনেক মানুষকে মাদক মামলায় জেলে ঢুকিয়েছি। মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকতে হবে না, আমি জড়িত বানিয়ে দিতে পারি।'
বাপ্পীর দাবি, ওই সময় এসআই বিলায়েত তাকে হবিরবাড়ী ইউনিয়নের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে এবং এলাকার মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসিক টাকা তোলার ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেন। তিনি রাজি না হওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে গালিগালাজ করেন এবং বলেন, 'তুই কেমনে এলাকায় থাকস, আমি দেখব। আমার সম্পর্কে সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ থানায় খোঁজ নিয়ে দেখ, কত মানুষকে জেলে ঢুকিয়েছি বলে হুমকি দেয়।'
অভিযোগপত্রে বাপ্পী উল্লেখ করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'বিউটিফুল ভালুকা' নামের একটি ফেসবুক পেইজে সবুজ মিয়াকে ৩২৪ পিস ইয়াবা ও নগদ ১ লাখ ৫৪ হাজার টাকাসহ গ্রেপ্তারের পরে ৩২৪ পিস ইয়াবা থেকে ২০ পিসে পরিবর্তিত হয় এমন একটি পোস্টে দেখতে পান। পরদিন তিনি জানতে পারেন, ওই ঘটনায় দায়ের করা ভালুকা থানার মামলা নং ৩৭ এ তাকে সবুজ মিয়ার সহযোগী হিসেবে পলাতক আসামি করা হয়েছে।
বাপ্পীর অভিযোগ, মামলায় সাক্ষী হিসেবে রয়েছে সোহেল মিয়া ও দুলাল মিয়া, তারা এসআই বিলায়েতের ভাড়া করা সিএনজি চালক, স্থানীয় লোকের স্বাক্ষী না নিয়ে কেন জিএনজি চালকদের স্বাক্ষী করা হয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থেকেও এজাহারে তাকে পালিয়ে যাওয়ার কথা কীভাবে উল্লেখ করা হলো? যদি তিনি পালিয়ে থাকেন, তাহলে তাকে গ্রেপ্তার করতে বা তার বাড়িতে কেন অভিযান চালানো হয়নি?
অভিযোগে তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরা রাত প্রায় ৪টা সাত মিনিটে সবুজ মিয়াকে গ্রেপ্তার করেন, যা বাড়ির সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়। অথচ জব্দতালিকায় সময় উল্লেখ করা হয়েছে ভোর ৫টা ৪৫ মিনিট। এছাড়া তিনি দাবি করেন, ২২ জুন রাত ৯টা ২২ মিনিটে তিনি নিজ বাসায় প্রবেশ করেন এবং ২৩ জুন সকাল ৯টা ১৬ মিনিট পর্যন্ত বাসাতেই ছিলেন। বাসার সিসিটিভি ফুটেজে বিষয়টি স্পষ্ট রয়েছে এবং ওই সময়ের মধ্যে তিনি একবারও বাইরে যাননি। ডিআইজির কাছে দেওয়া অভিযোগে বাপ্পী আহম্মেদ তার মোবাইল ফোনের কল ডিটেইলস (সিডিআর), থানার সিসিটিভি ফুটেজ, বাসার সিসিটিভি এবং অন্যান্য আলামত যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান। একই সঙ্গে মিথ্যা মামলা থেকে অব্যাহতি এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই মোঃ বিলায়েত হোসেন বলেন, 'সবুজ নামে যাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সে বলছে বাপ্পী তাকে সহযোগিতা করে। কিন্তু এজাহারে বাপ্পী দৌড়ে পালিয়ে গেছে লিখেছেন কেন জানতে চাইলে, এসব সাক্ষাতে বলবেন বলে জানান। তার বিরুদ্ধে ডিআইজির কাছে লিখিত অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই বিলায়েত বলেন, 'আমার নামে কোথাও কোনো অভিযোগ নেই।'
'২৩ জুন ভোরে সবুজ মিয়াকে গ্রেপ্তারের অভিযানে থাকা সঙ্গীয় ফোর্স এএসআই মেহেদী হাসান বলেন, ওইদিন রাতে সবুজের বাসার গেইটের সামনে থেকে সবুজকে গ্রেপ্তার করা হয়, তিনি বাপ্পী বা কাউকে দৌড়ে পালাতে দেখেননি। এএসআই তোফাজ্জল হোসেন ও এএসআই সালাউদ্দিন বাপ্পীর সাথে ফোন আলাপে একই কথা জানান, তারা কেউই বাপ্পীকে পালাতে দেখেননি। তাহলে কেন তাকে পলাতক আসামী করা হয়েছে জানতে চাইলে, সালাউদ্দিন জানান, এসআই বিলায়েত ভালো জানে।'
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, বিলায়েত প্রথমে একজন সাধারণ পুলিশ কনস্টেবল হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে কোনো প্রকার বৈধ প্রক্রিয়া বা পদোন্নতি ছাড়াই বিশেষ তদবিরে সরাসরি এসআই পদে ভর্তি হয়ে যান। সম্প্রতি নিয়ম অনুযায়ী তাকে পুলিশ এপিবিএনে বদলির আদেশ জারি করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে জোর তদবির চালান। ফলশ্রুতিতে, হেডকোয়ার্টার্স থেকে একটি (ডিউ) মাধ্যমে শুধু তাকে পূর্বের আদেশ বাতিল করে ময়মনসিংহ রেঞ্জে বদলির আদেশ দেন। তিনি ময়মনসিংহ রেঞ্জে নিজের বদলি নিশ্চিত করেন। এরপর ময়মনসিংহ জেলায় এসে সরাসরি ভালুকা শিল্পাঞ্চল পুলিশে যোগদান করেন এবং বর্তমানে সেখানেই কর্মরত আছেন। এই পুরো প্রক্রিয়াটিই হয়েছে একটি বিশেষ তদবিরের মাধ্যমে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভালুকা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম জানান, কোন নিরাপদ ব্যক্তি যদি মামলার আসামী হয়ে থাকে, তাহলে তদন্তপূর্বক তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে।
এ ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গফরগাঁও সার্কেল) মন্তুষ বিশ্বাস জানান, এখনো বিষয়টি তিনি অবগত নয়, অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযোগের বিষয়ে জানতে ময়মনসিংহ রেঞ্জ ডিআইজিকে একাধিকবার কল করা হলেও তা রিসিভ করেন ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এফপি/সা