দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, একাধিকবার কারাবরণ, শতাধিক মামলার আসামি হওয়া এবং রাজপথের সক্রিয় রাজনীতিতে তিন দশকের বেশি সময় কাটানোর পরও বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুল হক নান্নুর রাজনৈতিক অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি বলে মনে করছেন তাঁর অনুসারীরা। বিশেষ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পাওয়া এবং পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে দায়িত্ব না মেলায় তাঁদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের ভাষ্য, বিরোধী দলে থাকার সময় যাঁরা মাঠপর্যায়ে আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন না হলে তৃণমূলের কর্মীদের মধ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই আলোচিত ছিলেন মাহবুবুল হক নান্নু। ১৯৯৫ সালে ঢাকার কাকরাইলে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের একটি কনভেনশনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে তিনি বক্তব্য দেন। ওই বক্তব্যের একটি অংশ পরদিন বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হলে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম হয়।
এর এক বছর পর, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আগস্ট মাসে বরিশাল সার্কিট হাউস এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় কারাগারে থাকার পর তিনি মুক্তি পান। তাঁর সমর্থকদের দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে নানা প্রতিকূলতা ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও তিনি নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি।
ঝালকাঠি সদর উপজেলার নবগ্রাম ইউনিয়নের বীরসেনা গ্রামের একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে মাহবুবুল হক নান্নুর জন্ম। তিনি মরহুম আতাহার আলী খান ও ছখিনা বেগমের সন্তান। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা শুরু হয়। বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজে অধ্যয়নকালে ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ভিত্তি তৈরি হয়।
১৯৮৭ সালে তিনি বিএম কলেজ ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে সিনিয়র সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) নির্বাচিত হন। পরে ১৯৯৩ সালে তিনি বিএম কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন।
এরপর ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে বরিশাল বিভাগীয় সহসভাপতি হিসেবে দুবার দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০০১ সালে জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক, ২০০৮ সালে ঝালকাঠি জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক, ২০০৯ সালে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং ২০১৬ সালে বরিশাল বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুল হক নান্নু এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, “যেখানে জনগণ নির্বিঘ্নে সেবা পাবে না, সেখানে গিয়ে কোনো লাভ নেই। ব্যক্তিগত স্বার্থের কথা চিন্তা করলে অনেক আগেই আমি একটি ভালো চাকরিতে যোগ দিতে পারতাম। কিন্তু আমি তা করিনি। কারণ, রাজনীতিকে আমি কখনো ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখিনি।”
তিনি বলেন, ‘১৯৯৩ সালেও আমার সামনে ভালো চাকরির সুযোগ ছিল। কিন্তু আমি সেদিকে এগোইনি। বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের ভিপি হিসেবে আমি যে সম্মান পেয়েছি, সেটিই আমার জীবনের অন্যতম বড় অর্জন। দক্ষিণাঞ্চলের হাজারো শিক্ষার্থীর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। এই কলেজের অনেক সাবেক শিক্ষার্থী আজ দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করছেন। কেউ সংসদ সদস্য, কেউ মন্ত্রী, আবার কেউ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। আমিও চাইলে চাকরির পথ বেছে নিতে পারতাম, কিন্তু সে পথে হাঁটিনি।’
দলের প্রতি নিজের অবস্থান তুলে ধরে মাহবুবুল হক নান্নু বলেন, ‘আমি কখনো দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাইনি, ভবিষ্যতেও যাব না। আমার কোনো লোভ নেই। আগেও ছিল না, এখনও নেই। ঝালকাঠি একটি ছোট জেলা। দল যাকে যোগ্য মনে করেছে, তাকেই মনোনয়ন দিয়েছে। এ নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ বা আক্ষেপ নেই।’
রাজনীতিতে ব্যক্তিস্বার্থের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যারা রাজনীতিকে সম্পদ অর্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন, আমি তাদের মতো নই। আমার কোনো বিত্ত বৈভব নেই। চাইলে অনেক আগেই সম্পদ গড়ে তুলতে পারতাম। এমনকি একটি কোচিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করলেও মাসে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা আয় করা সম্ভব হতো। কিন্তু আমি সেটিও করিনি।’
জুলাই আন্দোলনের শহীদদের প্রসঙ্গ টেনে নান্নু বলেন, ‘শহীদ আবু সাঈদ, মুগ্ধসহ অসংখ্য মানুষ আত্মত্যাগ করেছেন। তাঁদের আত্মদানের যথাযথ মর্যাদা দেওয়াই আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। নলছিটি থেকে ঢাকায় আন্দোলনে অংশ নিয়ে চারজন তরুণ প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর মতো উদ্যোগ খুব বেশি দেখা যায়নি। ঢাকায় গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হওয়া সেলিমের পরিবারও প্রত্যাশিত সহযোগিতা পায়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এত কর্মসূচি পালিত হচ্ছে, কিন্তু শহীদ পরিবারের সদস্যরা আসলে কী পেলেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। তাঁদের সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।’
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের ত্যাগ-তিতিক্ষার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘১৯৯৬ সালে বরিশাল কারাগারে আমার ওপর যে নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তাতে আমার বেঁচে থাকার কথাই ছিল না। প্রতিটি রাত মনে হতো, হয়তো আর সকাল দেখা হবে না। আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় ছিল আমি ৮ বার গ্রেপ্তার হয়েছি। গ্রেপ্তারের সময় প্রতিবারই মনে হয়েছে এবার মনে হয় আমাকে গুম করা হবে বা হত্যা করা হবে। আলহামদুলিল্লাহ তারপরও তো বেঁচে আছি এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’
মনোনয়ন না পাওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আগেও কয়েকবার মনোনয়ন চেয়েছি, ভবিষ্যতেও হয়তো আর নাও চাইতে পারি। তবে দল যাকে যোগ্য মনে করেছে, তাকেই দায়িত্ব দিয়েছে। এ নিয়ে আমার কোনো আফসোস নেই।’
দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করে মাহবুবুল হক নান্নু বলেন, ‘এখন তারেক রহমানই আমাদের নেতা। তাঁর নেতৃত্বেই দল এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি দেশের দায়িত্ব পালনে সফল হলে সেটিকেই আমাদের নিজেদের সাফল্য বলে মনে করব।’
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের রাজনীতিতে ত্যাগ ও অবদানের মূল্যায়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, আন্দোলন-সংগ্রামে সামনের সারিতে থাকা নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন না হলে তৃণমূল পর্যায়ে হতাশা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
অবশ্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আরেকটি অংশ মনে করে, দলীয় পদায়ন ও মনোনয়নের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ত্যাগের পাশাপাশি সাংগঠনিক দক্ষতা, জনসম্পৃক্ততা, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং কৌশলগত সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সব মিলিয়ে মাহবুবুল হক নান্নুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন আবারও একটি প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে—বাংলাদেশের রাজনীতিতে ত্যাগ ও অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন কতটা নিশ্চিত হচ্ছে?
এফপি/অ