ইউটিউবের জনপ্রিয় চ্যানেল 'প্রেডিক্টিভ হিস্ট্রি'-র সঞ্চালক অধ্যাপক জিয়াং শুইকিন এখন নেট দুনিয়ায় ভাইরাল। কারণ, তিনি আগেভাগেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে ইরান-মার্কিন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় হবে। চীনা-কানাডীয় এই শিক্ষাবিদ ২০২৪ সালে একটি অনলাইন বক্তৃতায় এই মন্তব্য করেছিলেন। ইারনের যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর এখন যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে, তখন তাঁর সেই ভিডিওটি আবারও ছড়িয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালে জিয়াং তিনটি বড় ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন: প্রথমটি ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন; দ্বিতীয়টি ছিল ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করবেন। যেহেতু তাঁর এই দুটি ভবিষ্যদ্বাণীই সত্যি হয়েছে, তাই সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীরা তাঁকে ‘চীনের নস্ট্রাডামাস’ বলে ডাকতে শুরু করেছেন।
কে এই জিয়াং শুইকিন?
জিয়াং শুইকিন বেইজিংয়ে দর্শন ও ইতিহাস পড়ান। ইয়েল কলেজের এই স্নাতক তাঁর কর্মজীবনের বেশিরভাগ সময় কাটান চীনে শিক্ষা সংস্কার ও পাঠ্যক্রম তৈরির কাজে। শিক্ষার বাইরে তিনি তাঁর ইউটিউব প্রজেক্ট ‘প্রেডিক্টিভ হিস্ট্রি’-র মাধ্যমে অনলাইনে একটি বিশাল অনুসারী গোষ্ঠী তৈরি করেছেন। তাঁর লেকচারগুলোতে তিনি মূলত ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি, ভূ-রাজনৈতিক চালিকাশক্তি এবং 'গেম থিওরি' বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন ঘটনার পূর্বাভাস দেওয়ার চেষ্টা করেন।
তাঁর এই পদ্ধতিটি লেখক আইজ্যাক আসিমভের 'ফাউন্ডেশন' উপন্যাসের কাল্পনিক বিজ্ঞান কাহিনী ‘সাইকোহিস্ট্রি’র ধারণা থেকে অনুপ্রাণিত—যেখানে দীর্ঘমেয়াদী ঐতিহাসিক ধরণ বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দেওয়া হয়।
যে ভবিষ্যদ্বাণীটি বিতর্ক উসকে দিয়েছে
২০২৪ সালের মে মাসে রেকর্ড করা একটি বহুল আলোচিত লেকচারে জিয়াং যুক্তি দিয়েছিলেন যে, ট্রাম্প যদি আবারও ক্ষমতায় আসেন, তবে ভূ-রাজনৈতিক চাপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে। তিনি সতর্ক করেছিলেন যে, এই সংঘাত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে।
ইতিহাসের উদাহরণ টেনে জিয়াং ইরানের ওপর সম্ভাব্য মার্কিন আক্রমণকে 'সিসিলিয়ান এক্সপেডিশন'-এর সাথে তুলনা করেছেন—যেখানে এথেন্স একটি বিশাল সামরিক অভিযান শুরু করে যা শেষ পর্যন্ত চরম বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছিল। তিনি যুক্তি দেখান যে, ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান এবং বিপুল জনসংখ্যার কারণে সেখানে দীর্ঘস্থায়ী দখলদারত্ব বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন হবে। পার্বত্য অঞ্চল, দীর্ঘ সরবরাহ লাইন এবং শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ দ্রুত একটি প্রথম দিকের সামরিক সাফল্যকে কৌশলগত ব্যর্থতায় পরিণত করতে পারে।
মার্কিন টিভি শো-তে যা বলেছেন জিয়াং
সম্প্রতি নিউজ ও ওপেনিয়ন সিরিজ 'ব্রেকিং পয়েন্টস'-এ উপস্থিত হয়ে জিয়াং তাঁর আশঙ্কার কথাগুলো বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “যুদ্ধ যেভাবে এগোচ্ছে, আমার বিশ্লেষণ অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইরানের সুবিধা অনেক বেশি। বাস্তবতা হলো, এটি এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি 'ক্ষয়কারী যুদ্ধ' এবং ইরানিরা গত ২০ বছর ধরে এই সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে।”
জিয়াং শুইকিন আরও বলেন, ‘তাদের অনেক মহড়া হয়েছে। গত জুনের ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানিরা ইসরায়েলি এবং আমেরিকানদের আক্রমণ করার সক্ষমতা খুব কাছ থেকে পরীক্ষা ও বিশ্লেষণ করার সুযোগ পেয়েছে। এই নতুন আক্রমণের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিতে তারা আট মাস সময় পেয়েছে।’
এই শিক্ষাবিদ আরও মনে করেন, ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো—হুথি, হিজবুল্লাহ এবং হামাস—মার্কিনীদের মানসিকতা বুঝতে পেরেছে। এখন তাদের কাছে মার্কিন সাম্রাজ্যকে দুর্বল এবং শেষ পর্যন্ত ধ্বংস করার জন্য বেশ ভালো কৌশল রয়েছে। জিয়াংয়ের মতে, এই যুদ্ধ দীর্ঘ সময় ধরে চলবে এবং যখন এটি শেষ হবে, তখন বিশ্ব আর আগের মতো থাকবে না।
জিয়াংয়ের এই বৃহত্তর ভবিষ্যদ্বাণীগুলো শেষ পর্যন্ত কতটা সঠিক প্রমাণিত হবে তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত নেট দুনিয়ায় অন্যতম আলোচিত ভূ-রাজনৈতিক ‘পূর্বাভাসদাতা’ হয়ে উঠেছেন এই অধ্যাপক।
এফপি/এমআই