| শিরোনাম: |

‘খিচুড়ির সঙ্গে আলু ম্যাশ (ভর্তা), পোলাওয়ের সঙ্গে মাছের ঝোল আর করলা ভর্তা দিয়ে পরোটা।’– রাজধানীর গোপীবাগের অর্চনা রায় শুক্রবার দুপুরে খাবার নিয়ে ফেসবুকে এমন স্ট্যাটাস দেন। অনেকের কাছে খাবারের এ রেসিপি বিদঘুটে লাগতে পারে। কিন্তু গত কয়েক দিন অর্চনা রায়ের বাসায় খাবারের এমন আয়োজনই ছিল। তিন দিন ধরে লাইনে গ্যাস নেই। বাধ্য হয়ে ইনডাকশন কুকার কিনেছেন। ওই স্ট্যাটাসে তিনি ব্যঙ্গ করে লেখেন, ‘রাইস কুকারে ভাত, ইলেক্ট্রিক চুলায় তরকারি আর ইলেক্ট্রিক কেটলিতে জল গরম। সুখের সীমা নাই। হ্যাপি শুক্রবার।’
শুধু অর্চনাদের গোপীবাগেই নয়, গত কয়েক দিন ঢাকাজুড়ে পাইপলাইনের গ্যাসে মারাত্মক স্বল্পচাপ বিরাজ করছে। দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় আগুন জ্বলছে না। কোথাও আবার অল্প আঁচে টিমটিম করে জ্বললেও রান্না করতে লাগছে দ্বিগুণ সময়। এ সংকটের মধ্যেই বিকল্প হিসেবে এলপিজির দিকে ঝুঁকছেন অনেকে। কিন্তু সেখানেও চলছে চরম নৈরাজ্য– সিলিন্ডার মিলছে না, আর মিললেও কিনতে হচ্ছে দ্বিগুণ দামে।
রাজধানীর বেগুনবাড়ি এলাকার বাসিন্দা সালমা আক্তার গৃহকর্মীর কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘ভোরে বাসা থেকে বের হওয়ার আগে গ্যাস থাকে না। কাজ শেষে রাতে ফিরি। অনেক সময় রাত ১২টার পর সামান্য গ্যাস আসে। তখনই লাইনে দাঁড়িয়ে রান্না করতে হয়। সারাদিন গ্যাস না থাকায় সংসার চালানো খুব কষ্টকর হয়ে পড়েছে।’
ধানমন্ডি ১৫ নম্বর এলাকার বাসিন্দা ও বেসরকারি চাকরিজীবী রাশেদ মাহমুদ বলেন, ‘সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে দেখি চুলা ঠিকমতো জ্বলে না। অল্প আঁচে রান্না করতে অনেক সময় লাগে। গ্যাস সাধারণত গভীর রাতে আসে। এখন বাধ্য হয়ে রাইস কুকার ব্যবহার করছি।’
বনশ্রীর ব্লক-ডি এলাকার বাসিন্দা নাহিদ হাসান জানান, ভোরে কিছুক্ষণ গ্যাস পাওয়া যায়। তখনই সকালের রান্না শেষ করতে হয়। এরপর সারাদিন চুলা জ্বলে না। দুপুরের খাবার বাইরে থেকে কিনে খেতে হচ্ছে।
লাইন গ্যাসের সংকটের তিন কারণ
তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ গতকাল রাতে বলেন, ঢাকায় স্বল্পচাপের এই পরিস্থিতির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত– সরবরাহ কম। দ্বিতীয়ত– প্রচণ্ড ঠান্ডার কারণে অনেক এলাকায় পাইপে গ্যাস জমে সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। বাইরের দেশে এ সমস্যা সমাধানে বিকল্প পদ্ধতিতে পাইপ উষ্ণ রাখা হয়, যা আমাদের দেশে নেই। তৃতীয়ত– গত রোববার মালবাহী ট্রলারের নোঙরের আঘাতে আমিনবাজার এলাকায় তুরাগ নদের তলদেশে থাকা একটি বিতরণ পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জরুরিভিত্তিতে মেরামত করা হলেও কাজের সময় পাইপলাইনের ভেতরে পানি ঢুকে পড়ে। বিভিন্ন বাসা থেকে তাদের ফোন করা হচ্ছে। তারা গিয়ে লাইন পরীক্ষা করে দেখছেন প্রথমে পানি বের হচ্ছে। পরে গ্যাস আসছে। এ সমস্যাটা মোহাম্মদপুর এলাকায় বেশি। এ ছাড়া বৃহস্পতিবার উত্তরা এলাকায় লাইন প্রতিস্থাপনের জন্য ১০ ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ বন্ধ ছিল। শাহনেওয়াজ পারভেজ বলেন, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাচ্ছে।
এলপিজি বাজারে নৈরাজ্য
পাইপলাইনের গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবার এলপিজির দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু রাজধানীসহ সারাদেশে এখন সিলিন্ডার গ্যাসের তীব্র সংকট। রাজধানীর আদাবর এলাকার বাসিন্দা সিয়াম রহমান জানান, দুদিন ধরে মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডির বিভিন্ন দোকান ঘুরেও সিলিন্ডার পাইনি। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা কিনেছি।
শেখেরটেক এলাকার বাসিন্দা বিশ্বজিৎ দাস বলেন, তিন দিন ধরে বাসায় রান্না বন্ধ। গত বুধবার সিলিন্ডারের গ্যাস শেষ হয়েছে। গত দুদিন পুরো এলাকা ঘুরে সিলিন্ডার কিনতে পারিনি। বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে।
রাজধানীর আগারগাঁও এলাকার বাসিন্দা আওলাদ হোসেন বলেন, ‘সকাল থেকে কয়েকটি এলাকা ঘুরে শেষ পর্যন্ত একটি দোকান থেকে ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে ২,৩০০ টাকায়।’ সরকার নির্ধারিত দাম যেখানে ১,৩০৬ টাকা, সেখানে এমন দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকেই।
ঢাকার বাইরেও পরিস্থিতি একই। গাজীপুরের কোনাবাড়ী ও শিববাড়ী এলাকায় এক সপ্তাহ ধরে সিলিন্ডার সরবরাহ কম। চট্টগ্রামে অনেক দোকানে সিলিন্ডার উত্তোলন বন্ধ রাখা হয়েছে। কেউ কেউ গোপনে বেশি দামে বিক্রি করছেন। রাজশাহীতে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। হবিগঞ্জের মাধবপুরে ২০ দিন ধরে তীব্র গ্যাসের সংকট চলছে। নারায়ণগঞ্জে দোকান বন্ধ রেখে গোপনে ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকায় সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বেড়েছে বৈদ্যুতিক চুলার বিক্রি
গ্যাসের এ দ্বিমুখী সংকটে হঠাৎ বেড়েছে বৈদ্যুতিক চুলার চাহিদা। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও শ্যামলীর একাধিক দোকানে বৈদ্যুতিক চুলার মজুত শেষ হয়ে গেছে। বিক্রেতারা জানান, সাধারণ সময়ের তুলনায় বিক্রি প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। বাজারে ইন্ডাকশন ও ইনফ্রারেড– দুই ধরনের চুলা পাওয়া যাচ্ছে। দাম সাড়ে তিন হাজার থেকে ছয় হাজার টাকার মধ্যে। তবে চাহিদা বেশি থাকায় কিছু বিক্রেতা বাড়তি দাম নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ আছে।
সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সারি
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে রাজধানীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও। পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় স্টেশনগুলোতে গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও চালকরা চাহিদার অর্ধেক গ্যাসও পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে।
সপ্তাহজুড়ে রাজধানীর মগবাজার, মহাখালী, রামপুরা ও আশপাশের এলাকায় সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোর বাইরে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। স্টেশন কর্তৃপক্ষ জানায়, কমপ্রেসার চালু রেখেও পর্যাপ্ত গ্যাস তোলা যাচ্ছে না। একদিকে গ্রাহক ভোগান্তি বাড়ছে, অন্যদিকে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে ফিলিং স্টেশনগুলো। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির চালকরা। অনেক ক্ষেত্রেই সিলিন্ডার অর্ধেক খালি রেখেই ফিলিং স্টেশন ছাড়তে হচ্ছে। দিনের মধ্যে একাধিকবার লাইনে দাঁড়িয়ে গ্যাস নিতে হচ্ছে।
মালিবাগ এলাকার অটোরিকশাচালক জসিম উদ্দিন বলেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও পুরো গ্যাস পাওয়া যায় না। যেখানে ৩০০ টাকার গ্যাস নেওয়ার কথা, সেখানে ১০০ থেকে ১২০ টাকার বেশি পাওয়া যাচ্ছে না। এতে আয় ব্যাপকভাবে কমে গেছে। আরেক চালক শহিদুল ইসলাম বলেন, অর্ধদিবস চুক্তিতে গাড়ি চালাই। গ্যাস নিতে এত সময় চলে যায় যে, যাত্রী তোলার সুযোগই থাকে না।
বর্তমানে দেশে দৈনিক প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪১০ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে সব বিতরণ কোম্পানি মিলিয়ে সরবরাহ হচ্ছে ২৫০ থেকে ২৬০ কোটি ঘনফুট।
এফপি/অ