যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার পর ভেনেজুয়েলাজুড়ে সর্বাত্মক জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা সক্রিয় করা হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছে দেশটির সরকার। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম টেলিসুরের খবরে বলা হয়েছে, শনিবার (০৩ জানুয়ারি) ভোরে ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ নিশ্চিত করেছেন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর দেয়া আগের নির্দেশনা অনুযায়ী পুরো দেশ এখন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অধীনে কাজ করছে। এছাড়া সেনাবাহিনী ও পুলিশের নিখুঁত সমন্বয়ে “একক যুদ্ধ ব্লক” গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ।
যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং ফার্স্ট লেডি সিলিয়া ফ্লোরেসকে অপহরণের তথ্যও নিশ্চিত করা হয়েছে দেশটির পক্ষ থেকে। ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘এই নৃশংস পরিস্থিতি ও ভয়াবহ হামলার মুখে আমরা জানি না প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও ফার্স্ট লেডি সিলিয়া ফ্লোরেস বর্তমানে কোথায় আছেন।’ একই সঙ্গে তিনি জানান, মার্কিন সামরিক অভিযানে কারাকাসসহ দেশের আরও তিনটি রাজ্যে বোমা হামলা চালানো হয়েছে, যাতে সেনাসদস্য ও বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে মাদুরো ও ফ্লোরেসের তাৎক্ষণিক জীবিত থাকার প্রমাণ দাবি করেন ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং পুনরায় প্রেসিডেন্ট মাদুরোর সতর্কবার্তার কথা স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। মাদুরো আগেই বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের ক্ষেত্রে ভেনেজুয়েলাকে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে।
ডেলসি রদ্রিগেজ বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট মাদুরো ভেনেজুয়েলার জনগণকে প্রথম যে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা হলো—রাস্তায় নেমে আসুন, মিলিশিয়া হিসেবে সংগঠিত হয়ে জাতির সর্বাত্মক প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা সক্রিয় করুন।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্রেসিডেন্টকে অবৈধভাবে আটক করা এবং সাধারণ মানুষের ওপর বিমান হামলা চালানো আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আমাদের জনগণের বিরুদ্ধে এই বর্বর ও নৃশংস আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানাই, যা আমাদের দেশের সামরিক সদস্যদের হত্যা করেছে এবং নিরীহ ভেনেজুয়েলার নাগরিকদের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।’
ডেলসি রদ্রিগেজের বক্তব্যের পরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে সামরিক হামলার বিষয়ে প্রাথমিক মন্তব্য করেন। ট্রাম্প লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সফলভাবে ভেনেজুয়েলা ও দেশটির নেতা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। তাকে এবং তার স্ত্রীকে আটক করে দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।’ তিনি আরও জানান, বিস্তারিত তথ্য শিগগিরই প্রকাশ করা হবে এবং স্থানীয় সময় সকাল ১১টায় মার-আ-লাগোতে একটি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।
এই প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট পুলিশ ও সেনাবাহিনীর মধ্যে নিখুঁত সমন্বয় গড়ে তোলার আহ্বান জানান, যাতে তারা মাতৃভূমি রক্ষায় একযোগে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমাদের মুক্তিদাতা সাইমন বলিভারের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার কেউ ধ্বংস করতে পারবে না। ভেনেজুয়েলার জনগণকে পূর্ণ জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ, স্বাধীনতা ও ভবিষ্যৎ রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে।’
এদিকে ভেনেজুয়েলার আরেক রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এভিএনের খবরে জানানো হয়েছে, দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে “অপরাধমূলক সামরিক আগ্রাসনের” অভিযোগ তুলে জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা পূর্ণমাত্রায় সক্রিয় করার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর স্বাক্ষরিত ‘বাহ্যিক জরুরি অবস্থা’ সংক্রান্ত ডিক্রিকে সমর্থন জানিয়ে বলেন, এর আওতায় সর্বাত্মক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এই হামলাকে জঘন্য ও কাপুরুষোচিত আখ্যা দিয়ে পাদ্রিনো লোপেজ জানান, হামলার পর হতাহতদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এটি আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক হুমকি। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোর কাছে অভিযোগ জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের জন্য নিন্দা জানানোর আহ্বান জানান।
পাদ্রিনো লোপেজ ঘোষণা করেন, ‘বলিভারিয়ান ন্যাশনাল আর্মড ফোর্সেস (বিএএনএফ) বাহ্যিক জরুরি অবস্থা সংক্রান্ত ডিক্রিকে পূর্ণ সমর্থন দেবে এবং জাতির সর্বাত্মক প্রতিরক্ষায় সব সক্ষমতা মোতায়েন করবে। তিনি জানান, স্থল, আকাশ, নৌ, নদী ও ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীর ব্যাপক মোতায়েন শুরু হবে, যেখানে জনগণ, সেনাবাহিনী ও পুলিশের নিখুঁত সমন্বয়ে “একক যুদ্ধ ব্লক” গড়ে তোলা হবে।’
শেষে তিনি বলেন, ‘সম্মান, দায়িত্ব ও ইতিহাস আমাদের ডাকছে। মুক্ত মাতৃভূমির জয়ধ্বনি প্রতিটি প্রান্তে প্রতিধ্বনিত হোক। বিজয় আমাদেরই হবে, কারণ যুক্তি ও মর্যাদা আমাদের পক্ষে। আমরা জয়ী হবো। মাতৃভূমি চিরজীবী হোক!’
এফপি/এমআই