মায়ের মৃত্যুর দুই দিন না পেরোতেই বাবাকেও হারালেন দুই ভাই। আড়াই মাস ধরে কারাগারে থাকা ফরিদুল আলম (৪৩) ও মোহাম্মদ ইসলাম (৩৮) প্যারোলে মুক্তি পেয়ে হাতকড়া পরেই অংশ নিলেন মা ও বাবার জানাজায়। আর এ ঘটনাকে ঘিরে পেশাগত দায়িত্ব পালনে পুলিশ ও স্থানীয় সাংবাদিকরা উভয় সংকটের মুখে পড়েন।
পেশাগত কারণে সাংবাদিকের দরকার হাতকড়া পরা দুই ভাইয়ের নামাজে জানাজার অংশগ্রহণের ছবি।
আর পুলিশ চায় কারাবন্দি আসামির হাতকড়া পরা ছবি যাতে গণমাধ্যমে প্রকাশ না হয়। এজন্য পুলিশ গণমাধ্যমকর্মীদের ঘটনাস্থল থেকে সরাতে বিশেষ কৌশল হিসেবে গ্রামবাসীদের ব্যবহার করে। উত্তেজিত গ্রামবাসী এলাকা থেকে সাংবাদিকদের ধাওয়া দিয়ে সরিয়ে দেয়। এমনকি চারদিকে গ্রামবাসীর একপ্রকার পাহারায় অনুষ্ঠিত হয়েছে জানাজা।
কারাবন্দি দুই ভাই ফরিদুল ও ইসলাম কক্সবাজারের রামু উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের পানেরছড়া এলাকার মৃত নুর আহমদের ছেলে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে রামু থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। এসব মামলায় তারা প্রায় আড়াই মাস ধরে কক্সবাজার কারাগারে রয়েছেন।
গত ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে তাদের মা মোস্তফা বেগম (৮০) বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যান।
পরে জানাজা ও দাফনে অংশ নিতে দুই ভাইকে পাঁচ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়। দুপুরে দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের পানেরছড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ চত্বরে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পুলিশি পাহারায় বাড়িতে গিয়ে মায়ের মরদেহ দেখেন তারা। এরপর খাটিয়া কাঁধে তুলে দাফনের জন্য নিয়ে যান। এ সময় তাদের দুই হাতেই হাতকড়া ছিল।
হাতকড়ার সঙ্গে দড়ি বেঁধে তা পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। মায়ের জানাজায় হাতকড়া পরা অবস্থার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পুলিশের সমালোচনা শুরু হয়। এমনকি বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলতে থাকে। এর দুদিন পর গত ২৩ ফেব্রুয়ারি তাদের বাবা নুর আহমদ মারা যান। যথারীতি প্যারোলে মুক্তি পেয়ে বাবার জানাজায় অংশ নিতে এলাকায় যান দুই ভাই। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন মোড় নেয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, এর আগে মায়ের জানাজার ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশ গ্রামবাসীকে সতর্ক করে দেয়, কেউ যেন দুই ভাইয়ের ছবি তুলে গণমাধ্যমে প্রকাশ না করেন। অন্যথায় ভবিষ্যতে কোনো আসামির নিকটাত্মীয় মারা গেলে প্যারোলে মুক্তির ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলেও সতর্ক করে দেওয়া হয়। এমনকি এরকমও বলে দেওয়া হয় যে, তারা আর কোনোদিন কারাগার থেকে বের হওয়ারও সুযোগ পাবে না।
এ পরিস্থিতিতে বাবার জানাজার অনুষ্ঠান গ্রামবাসীর কড়া নজরদারির মধ্যে সম্পন্ন হয়। জানাজা অনুষ্ঠানের চারদিকে গ্রামবাসী সাংবাদিক প্রতিরোধে রীতিমতো পাহারা বসায়। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে স্থানীয় সাংবাদিকরা গ্রামবাসীর তোপের মুখে পড়ে কোনো রকমে পালিয়ে বাঁচার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
এ বিষয়ে রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, আমরা পুলিশ ও সাংবাদিক উভয় সংকটে পড়েছি। মায়ের জানাজায় হাতকড়া থাকার ছবি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। আবার বাবার জানাজায় হাতকড়া দৃশ্যমান থাকলে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা। অথচ সাংবাদিকদের পেশাগত কারণে ছবিও দরকার। আবার হাতকড়ার ছবি যাতে গণমাধ্যমে না আসে সেজন্য পুলিশের তৎপরতাও অস্বীকার করার জো নেই। যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবু ফাঁকফোকর দিয়ে অনেকেরই দূর থেকে ধারণ করা কয়েকটি ছবি সংগৃহীত হয়েছে।
ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। একদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের অবস্থান, অন্যদিকে মানবিক দৃষ্টিকোণ দুইয়ের টানাপোড়েনে প্রশ্ন উঠেছে প্যারোলে মুক্তি পাওয়া আসামিদের প্রতি আচরণ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও।
এফপি/এমআই